ভূমিকা: জীবনের অপরিমেয় ধারা নিয়ে আমরা সবাই কমবেশী বিভ্রান্ত। নিজেদের জীবন কোন দিকে যাচ্ছে, কিভাবে এর স্রোত বহমান, তা আমরা অনেক চেষ্টা করেও ঠিকমতো নির্ণয় করতে পারি না। একটু জীবনের সমীকরণকে বুঝে ফেলেছি মনে হলেও পাশে অন্য কারো জীবনের ধারা যখন ভিন্ন দেখি, তখন আবার সব গুলিয়ে যায়। মনে হয়, তার বৈঠা নিয়ন্ত্রণের কৌশল-ই বোধহ্য় আমায় অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু আমরা তো জানি, যে সবার জীবনের ধারা ভিন্ন, গতিবিধি ভিন্ন, স্রোত ভিন্ন, ঘনত্ব ভিন্ন। নিজের জীবনকে যেভাবে নিজের মতো করেও কোনো আকৃতিতে আনা যায়না, আবার অন্যের সাথে তুলনা করেও লাভ নেই, জীবনের সংজ্ঞা সদাকাল অস্পষ্ট। নীল চিরকুটেই যেমন, কারোর জীবনের ধারার সাথে কারও তুলনা নেই, সবাই জীবন নামের পৃথক ধারায় বহমান।
• লেখিকা সম্পর্কে মন্তব্য: রোদেলা আপুকে আমার একজন সম্ভাবনাময়ী লেখিকা বলে মনে হয়। উনি যেভাবে প্রণয়ের সুখ দু:খের উপাখ্যান লিখে মানসপটের আকাঙ্ক্ষাগুলোকে আস্কারা দিতে পারেন, মনের জগতে ফুটিয়ে তোলেন দীর্ঘ বর্ষণের পরে মেঘশূন্য আকাশে সূর্যাস্তের লাল আভা, তেমনই, বাস্তবতাকে বর্ণনা করেন ঠিক মাঝবেলার দিবাকরের তীর্যক আলোর মতোই ধারালোভাবে। সেই বাস্তবতাকেই লিখেন, যাকে উপেক্ষা করা যায়না, ঝেড়ে ফেলা যায়না, যা না ছাড়ে পিছু। বাস্তবতায় রাত আসে, তীর্যক আভার উষ্ণতা দমে আসে, কিন্তু কিছু পল পরেই তা আবার দিন হয়ে ফিরে আসে। এই আশ্চর্য মেধাবী লেখিকার বইয়ের রিভিউ লিখতে আমি বাধ্য। আবার, তিনি যে বইটি উৎসর্গ-ই করেছেন তার পাঠিকাদের জন্য।
• ঘরানা (Genre): নীল চিরকুট একটি সমসাময়িক সামাজিক-রোম্যান্টিক কথাসাহিত্য। প্রথমে বইটিকে মূলত প্রেম বিষয়ক মনে হলেও বইটিতে আসলে প্রেম আর সামাজিক বাস্তবতাকে সমানাভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বইয়ের মূল চরিত্রগুলো নম্রতা, আরফান, নীরা, নাদিম, রঞ্জন, অন্তু, ছোয়া এবং মৌশি। মৌশিকে মূল চরিত্র হিসেবে নেওয়া যেতেও পারে, আবার নাও যেতে পারে। যেহেতু তার অনেকখানি অবদান রয়েছে কিছু ক্ষেত্রে, তাই আমি তাকে মূল চরিত্রের মাঝে ধরে নিলাম।
• বিষয়বস্তু: গল্পের শুরু নম্রতাকে দিয়ে, কিশোরী বয়সে এমন এক সুপুরুষকে মন দিয়ে বসলো, যাকে ঘিরেই তার বেড়ে ওঠা যৌবনে। কিশোরীদের একটি মুদ্রাদোষ কি, তারা যার প্রেমে পরে, সেই ভাগ্যবান পুরুষই হয় তাদের মৌলিকতার ভিত্তি, আদর্শ। সেই পুরুষের গো ধরেই নম্রতার জীবনচলা, সুখ-দু:খ। ডক্টর আরফান, অ্যা জেন্টালম্যান, কল্পজগতের কল্পরাজ। জীবনকে গুছিয়ে চলতে পারদর্শী, বিচক্ষণ ও যত্নবান একজন পুরুষ। এনাকে নিয়ে যতই লিখবো, ততই কম পরে যাবে। এরপর আসে দু:খিনী নীরা, জীবনের পোড়া কয়লাপূর্ণ পথে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত নীরা। সে যন্ত্রণাদায়ক পথ থেকে যতই সরে যেতে চায়, সবাই তাকে আরও টেনে সেই পথেই দাঁড় করিয়ে দেয়। কিন্তু নীরারা কাঁদতে পারে, যা নাদিমরা পারে না। বিষে ভরা দগ্ধ হৃদয় নিয়ে এ পৃথিবী বিচরণ করে বেড়ানোই নাদিমদের কাজ। এ বিষের ঔষধ হয়তো আছে, হয়তো নেই। এ বিষ হয়তো ক্ষনে ক্ষনে ছড়িয়ে পরে পুরো হৃদয়জুড়ে, নয়তো দমে আসে স্বল্পতায়। এমন কিছু কিছু নাদিম নীরার সব দু:খকে উড়িয়ে দিয়ে ছায়ার মাধ্যম হয়ে পাশে থাকে রঞ্জন নামক মা-স্বরূপ বন্ধু। কে বলেছে ছেলেরা মন বোঝে না, মন পড়তে পারেনা, স্নেহ ছড়াতে পারেনা? সে হয়তো রঞ্জনকে দেখেনি। যদি দেখতো, তাহলে নীরা নাদিমদের হিংসে করতো। এমনই রঞ্জনের এক বাচ্চাসুলভ বন্ধু আছে, অন্তু। অন্তুর বয়সই বোধহয় তার শত্রু। বয়সটা আরেকটু বেশী হলে হয়তো তার জন্য সবকিছু একটু সহজ হতো, নিজেকে সামলানো, নিজের ভালোবাসার মানুষদের সামলানো, তাদের আগলে রাখা। বন্ধুমহলে বাকি আর একজন আছে, ছোঁয়া। অতিরঞ্জিত জীবনটা তার বন্দিশালার চেয়ে কম না। খাঁচায় বন্ধি রঙিন পাখিদের সাথে তার পার্থক্য এই যে, ছোয়াকে ঘিরে দৃশ্যমান লৌহপ্রাচীর নেই শুধু। পাখিদের খাঁচার মাঝের স্বস্তি হয় একটুখানি ডানা ঝাপটানো, ছোয়ার ডানা হলো তার বন্ধুমহল। অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি জীবনে বন্ধুরা তার স্বাধীনতা। বাকি থাকে মৌশি। মৌশিকে ব্যাখ্যা করতে বলবো, শূন্যস্থান ছাড়া জীবন অপূর্ণ, আবার সেই শুণ্যস্থানই করে জীবনকে পূর্ণ। কিছু না পাওয়া বস্তু থাকা উচিত অবশ্যই জীবনে, নইলে জীবনের রসকে উদঘাটন করা মুশকিল। আরেকজনকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা উচিৎ, মিষ্টি। গল্পে তার আগমন অতি স্বল্প, কিন্তু আমার মনে সে বিস্তর প্রভাব ফেলে রেখে গিয়েছে, তার মিষ্টতা দিয়ে, একাকিত্বতা দিয়ে, নাদিমের আপন একজন হয়ে তাকে আগলে নেয়ার চাহিদা দিয়ে। এই সবগুলো মানুষের প্রেম, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব দিয়েই মূলত নীল চিরকুটের অস্তিত্ব।
• প্রভাব ও অনুভুতি: এইযে সবার এমন ভিন্ন জীবন, কারও যন্ত্রনার সাথে কারও মিল নেই, কত আলাদা তাদের দু:খের ধরণ। কেউ বাস্তবতার জালে আটক, তো কেউ হৃদয়ের মান অভিমানের দ্বন্ডে আটক। সমাজের নির্ধারিত মাত্রা অনুয়ায়ী বাস্তবতার আক্রোশের পাল্লার পাশে মানষিক যন্ত্রনার পাল্লা অনেক হালকা মনে হতে পারে। এমন মনে হতে পারে যে, 'আজব! মানুষ খাবার পায়না, আর এরা এসেছে ছোটখাট না পাওয়ার আক্ষেপে ঘুমোতে পারেনা'। কিন্তু কাছ থেকে দেখতে গেলে আসলে কারও দুর্দশার পাল্লার সাথে অন্যকারো দুর্দশার পাল্লার তুলনাই করা যায়না। একজনের কষ্টের পাশে আরেকজনের কষ্টকে রেখে সেগুলোর মধ্যে থেকে কম বেশী বের করা অসম্ভব। নীল চিরকুটে এই ব্যাপারটাই আমি সবচেয়ে আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করেছি। সবার যন্ত্রনার কারণ আলাদা, ধরণ আলাদা, কিন্তু কেউ কম কষ্টে নেই। কারও কষ্টকেই ছোট করে দেখা যাচ্ছেনা। আবার, এই পৃথক ধরনের জীবন ধারা গুলোই যখন একত্রিত হচ্ছে, মিলেমিশে ঘুরছে, সঙ্গ দিচ্ছে একে অপরকে, তখন সৃষ্টি হচ্ছে অতুলনীয় সুখের তান্ডব।
• ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক: গল্পের মূলকাহিনী ফেইসবুকের সাথে একই হলেও দুটোর শব্দচয়ন ও প্রকাশভঙ্গিতে বিস্তর তফাৎ। বইয়ের নীল চিরকুট আরও নিখুঁত, প্রতিটি বিবরণ ও খুঁটিনাটি বিষয়বস্তু আরও বিস্তারিত ও স্পষ্ট। বইয়ের নীল চিরকুটে বাস্তবতার ব্যাপারগুলো লক্ষ্য করলে লেখিকার আগের লেখার হাত ও এখনকার লেখার হাতের মাঝে অনেকখানি পার্থক্য বোঝা যায়। প্রতিটি চরিত্রের বিষয়বস্তুতে অনেক সূক্ষ্মভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বইয়ে। বন্ধু মহলের আবেগ আরো প্রবল ও মনোমুগ্ধকর। প্রেম বিষয়ক ব্যাপারগুলো, আলোচনা, অনুভূতি এগুলোও বেশ চমৎকার। ইংরেজি ভাষার কথাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঠিক আছে তবে কিছু কিছু যায়গায় উচ্চারণ আর ব্যাকরণে একটু অগোছালো হয়তো লেগেছে, তবে তা সহিষ্ণু।
• উপসংহার: রোদেলা আপুর লেখার হাত অনেকটাই তরতাজা, তবে আমার মনে হয় তার প্রতিভার প্রস্ফুটন আর অল্প কিছু বাকি আছে। তা সময় ও অভিজ্ঞতার সাথে সাথে ঠিকই প্রকাশ পাবে। প্রথম বই হিসেবে নীল চিরকুট বেশ প্রশংসনীয়, ব্যক্তিগতভাবে আমি বইটিকে ৮.৫/১০ রেটিং দিচ্ছি। এমন চর্চা থাকলে আমার বিশ্বাস ভবিষ্যতে আরও অনেক হৃদয়স্পর্শী গল্প - উপন্যাস পাবো। লেখিকার থেকে আরও অনেক গল্প শোনা বাকি, তার লেখা পড়ে বহু অনুভূতি উপলব্ধি করা বাকি, আরও ভিন্ন জীবনের ধরন সম্পর্কে আশ্চর্য হওয়া বাকি।
বই ছবি ও রিভিউ- Raujatu Rumman Maria
